শিরোনাম:
এবার রাবির নতুন উপ-উপাচার্যকে ঘিরে বিতর্ক রাবির নতুন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম টিপু রাবি প্রশাসনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাউকে দায়িত্ব না দেওয়ার ও দ্রুত ভিসি নিয়োগের দাবিতে মানববন্ধন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শনের চর্চা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বিতর্কিত ভূমিকার কাউকে ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগ কেউই মেনে নেবে না’ ইতিহাসবিদ এ বি এম হোসেন : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবস্তম্ভ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে উপাচার্যের নির্বাহী আদেশ অমান্যসহ তথ্য গোপনের অভিযোগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অফিসারদের উপস্থিতি চোখে পড়ে ‘হ্যাটস অফ টু ইউ স্যার’ ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর তনয়া, দেশরত্ন শেখ হাসিনা আপা, আপনি আস্থা ও ভরসার শেষ ঠিকানা’
৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৩শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ইতিহাসবিদ এ বি এম হোসেন : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবস্তম্ভ

রফেসর ড. এ বি এম হোসেন

মো. সফিকুল ইসলাম

 রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ‘প্রফেসর ইমেরিটাস’। প্রফেসর ড. এ বি এম হোসেন। একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইতিহাসবিদ। ‘এ বি এম হোসেন’ নাম উচ্চারণ করলেই যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব বেড়ে যায়।

ড. এ বি এম হোসেন ‘ত্রিকালদর্শী। বৃটিশ আমলে পড়াশুনা শুরু করেন; পাকিস্তান আমলে অধ্যাপনায় ব্রতী হন; স্বাধীন বাংলাদেশে খ্যাতির শীর্ষে উঠেন। এমন গৌরবদীপ্ত শিক্ষক বাংলাদেশে বিরল, যিনি একটানা ৬০ বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ৪০ বছর নিয়মিত শিক্ষক, ২০ বছর ইমেরিটাস প্রফেসর। এ-এক অনন্য কাব্যিক গৌরবের মহাজীবন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরই শুধু নন, প্রফেসর এ বি এম হোসেন বাঙালি জাতিরও গৌরবস্তম্ভ। ১৯৭৭ সালে নরওয়ের জাতীয় সংসদ নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য গঠিত বোর্ডে তাঁকে মনোনীত সদস্য নির্বাচিত করে। এই বিরল সম্মান অতি দেশ-জাতির জন্য অতি গৌরবের, তাই তিনি বিশ্ব-বাঙালিরও অহংকার।

বিরল সম্মাননার আরেকটি হচ্ছে, ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ বিশেষ মর্যাদা দিয়ে ১৯৮৪ সালে প্রফেসর এ বি এম হোসেনকে ‘ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি)’ কনফারেন্স-এ নিয়ে যান। তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ওআইসি কনফারেন্স-এ মূল অধিবেশনে ‘keynote speaker’ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে তিনি অভিভাষণ রাখেন ইসলামি স্কলার হিসেবে। বাংলাদেশের পণ্ডিত হিসেবে ইসলামি বিশ্বে তখন ড. এ বি এম হোসেনের নাম সমাদৃত হয়। ইসলামি বিশ্বের দেশসমূহের সরকার প্রধান ও রাস্ট্র প্রধানগণ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন। দেশ-বিদেশে আর বহু সম্মানায় এ বি এম হোসেন ভূষিত।

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার  গৃহীত ‘১৯৭৩ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন’ (৭৩’র অধ্যাদেশ নামে খ্যাত) কমিটির তিনি সদস্য ছিলেন।

‘ইমেরিটাস প্রফেসর’ হওয়ার কারণে ড. এ বি এম হোসেন আমৃত্যু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০১ সালে ‘প্রফেসর ইমেরিটাস’ হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৭২ সালে পূর্ণ প্রফেসর হন।

২০২০ সালের ১০ জুলাই দিবাগত রাত ২টায় (তখন ১১ জুলাই) মহান এই শিক্ষক তাঁর ঢাকার কলাবাগানের বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। মিরপুরের বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে বাংলার এই অমর সন্তানের দাফন হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬।

কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘ধামতী’ গ্রামে ড. এ বি এম হোসেন ১৯৩৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক খ্যাতিমান এক মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম আবুল বাশার মোশাররফ হোসেন। গ্রামের সাথে নিমমিত যোগাযোগ রাখতেন। গ্রামে শৈশবে তাঁর পড়া বিদ্যালয়ে তিনি পিতা-মাতার নামে ট্রাস্ট্র গঠন করে শিক্ষাবৃত্তি চালু করেন।

দেবিদ্বার রিয়াজুদ্দিন পাইলট স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে মাধ্যমিক ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে ১৯৫১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। ‘বেঙ্গল স্ট্যান্ড’ করা ছাত্র হিসেবে এখনও কুমিল্লা অঞ্চলে অতি প্রবীন লোকদের কাছে তাঁর মেধার খ্যাতি শোনা যায়। এরপর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পেয়ে প্রথম শেণিতে প্রথম হয়ে ১৯৫৪ সালে স্নাতক ও ১৯৫৫ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভের পর তিনি কেন্দ্রিয় সরকারের সরকারি মেধাবৃত্তি নিয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৫৮ ও ১৯৬০ সালে ইতিহাস ও ইসলামি প্রত্নতত্ত্বে যথাক্রমে বিএ অনার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

মোগল সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহম্মদ আকবর-এর রাজপ্রাসাদ ফতেপুর সিক্রি বিষয়ে পিএইচডি থিসিস লিখেন। তাঁর পিএইচডির বিষয়বস্তু ছিলো ‘History and Archaeology of Fathpur-Sikri. School of Oriental and African Studies’।

বঙ্গীয় সভ্যতার পাদপীঠ প্রাচীন ‘সমতট’ রাজ্যের (এখনকার কুমিল্লা) রাজধানী বা প্রধান কেন্দ্র লালমাই ও ময়নামতি’র প্রত্নতাত্ত্বিক প্রথম খনন শুরু হয় ১৯৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে। প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. এফ এ খান খননের নেতৃত্বে দেন। খনন দল ময়নামতি ও লালমাইয়ের ১৮ কিলোমিটার প্রত্ন-এলাকার বিভিন্ন ধ্বংসস্তূপ থেকে শালবন মহাবিহার (সপ্তম শতকের একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়)-সহ বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন খুঁড়ে-খোঁজে বের করেন।

ময়নামতিতে প্রাপ্ত প্রত্নসম্পদ মাতৃভূমির হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস; বাঙালির গৌরবের ইতিহাস, যে ইতিহাস সৃষ্টির জনক হয়েছেন খনন দলের প্রতিটি সদস্য। এ বি এম হেসেন-এর নামও লেখা হয়েছে এই গৌরবের ইতিহাসের সোনালী পাতায়। কারণ তিনি ছিলেন এই খনন দলের একজন সদস্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাধারণ রেজাল্টের কারণে এ বি এম হোসেনের মেধা-খ্যাতি তখন পাকিস্তান সরকার ও বিদ্ব্যৎসমাজে ব্যাপকৃতভাবে সমাদৃত হয়। তৎকালিন পাকিস্তান কেন্দ্রিয় সরকারের সিদ্ধান্তে এ বি এম হোসেনকে ময়নামতির প্রত্নতাত্ত্বিক খনন দলের সদস্য করা হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. ফজলুল হক, যিনি প্রফেসর এ বি এম হেসেনের গৌরবদীপ্ত ছাত্র ও সহকর্মী। তিনি জানান, ‘স্যার শিক্ষকতা জীবনে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একস্ট্রা মুরাল লেকচারার, নাফিল্ড ফেলো, ইউনেস্কো ইন্টারন্যাশনাল ফেলো এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আগাখান ফাউন্ডেশন ফর ইসলামিক আর্কিটেকচারের উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর নিবিড় গবেষণার বিষয়বস্তু ইসলামী শিল্পকলা হলেও তিনি তাঁর মূলধারার বিষয় মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ইতিহাস থেকে বিচ্যুত হননি।’

প্রফেসর এ বি এম হোসেন রচিত ১১টি আকর গ্রন্থ দেশ-বিদেশে পণ্ডিতমহলে ব্যাপক সমাদৃত। ‘পরন্ত বেলার গল্প’। প্রফেসর এ বি এম হোসেনের আত্মজীবনী। জীবনী গ্রন্থটি জ্ঞানের আধার। গৌরবের অসামান্য দলিল। শৈশব-শিক্ষা-বেড়ে ওঠা, মুক্তিসংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধ, রণাঙ্গনের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন্ত-বিবরণ ছাড়াও বিশ্বপণ্ডিত-সমাজে তাঁর বিচরণের গৌরবসাক্ষী ‘পরন্ত বেলার গল্প’-তে।

ড. এ বি এম হোসেনের দীর্ঘ শিক্ষা জীবনের গবেষণা ও অভিজ্ঞতার ফসল ইউজিসি কর্তৃক প্রকাশিত ‘মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস : অটোম্যান সাম্রাজ্য থেকে জাতিসত্ত্বা রাষ্ট্র’ গ্রন্থটি। বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুসলিম শিল্পকলা’, ‘আরব স্থাপত্য’ ছাড়াও প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের বিভিন্ন ঘরানার বাংলা ও ইংরেজি ভাষার রচিত গ্রন্থ এবং শতাধিক মৌলিক প্রবন্ধের তিনি জনক।

পৃথিবীর বিখ্যাত জার্নালসমূহে তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ হতো। তিনি তত্ত্বাবধান, সম্পাদনা ও নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশ-বিদেশের বহু গবেষণা কর্ম। দেশে বিদেশে বহু মনীষীর সংস্পর্শে এসেছেন, আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে যোগদান করেছেন এবং তাঁদের সান্নিধ্য ও জ্ঞানচর্চায় আলোকিত হয়েছেন।

১৯৮৫ সালে এথেন্সে অনুষ্ঠিত মানবাধিকার কমিশনে বাংলাদেশের পক্ষে পর্যবেক্ষক সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ও বাংলা একাডেমির সম্মানিত আজীবন ফেলো ছাড়াও দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানের সদস্য ছিলেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর এ বি এম হোসেন সকলের পরম শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।  স্যারের শিক্ষকতা জীবনের সায়াহ্নে দেখেছি, স্যার যদি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন, উপাচার্যের গাড়ি স্যারকে ক্রস করে এগিয়ে যেতো না। আমি নিজে স্বাক্ষী, এ বি এম স্যার একদিন প্যারিস রোড দিয়ে হেঁটে বাসার দিকে যাচ্ছেন, স্যারের পেছনে গাড়ি থেমে গেল, গাড়ি থেকে নেমে এলেন উপাচার্য প্রফেসর ড. সাইদুর রহমান খান (তিনি পরবর্তীতে বৃটেনে বাংলাদেশের হাই কমিশনার)। উপাচার্য মহোদয় বিনয়ে সালাম দিয়ে স্যারের সাথে মৃদস্বরে কথা বলতে বলতে স্যারের পেছন পেছন হাঁটতে লাগলেন।

ড. সাইদুর রহমান খানের উপাচার্যের মেয়াদেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষক ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য ড. এ বি এম হোসেনকে ‘প্রফেসর ইমেরিটাস’ হিসেবে নিযুক্ত করে এবং তিনিই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ‘ইমেরিটাস প্রফেসর’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ একাডেমিক ভবনের ২০৪ নম্বর কক্ষটি ‘ইমেরিটাস প্রফেসর এ বি এম হোসেন গ্যালরি’ নামে নামকরণ করা হয়েছে।

ড. এ বি এম হোসেনের বর্ণাঢ্য জীবন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ প্রফেসর ড. শাহানারা হোসেন তাঁর স্ত্রী। ইতিহাসবিদ এই দম্পতির দুই ছেলে এক মেয়ে। এঁরা সকলেই কৃত্বিপূর্ণ ছাত্র ছিল। মেয়ে ও ছোট ছেলে এক সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষতা করেছেন। মেয়ে আমেরিকায় ও এবং ছোট ছেলে কানাডার  প্রবাসী এবং সে-দেশের শ্রেষ্ঠ ভূ-বিজ্ঞানীদের একজন। বড় ছেলে ঢাকায় বসবাসরত, খ্যাতিমান ব্যাংকার।

ড. শাহানারা হোসেনের অসাধারণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রয়েছে। ‘শেষ বেলার পাঁচালি’ তাঁর  বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ, বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে। ‘প্রাচীন বাংলার ইতিহাস’, `Ancient History of Bengal’-সহ তাঁর সকল গ্রন্থ ও রচনা পণ্ডিত সমাজে সমাদৃত।

শাহানারা হোসেনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর গ্রামে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবদুল হাফিজ, শাহানারা হোসেনের পিতা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মমতাজ উদ্দীন আহমেদ (তিনিও ব্রাহ্মাণবাড়ীয়ার মানুষ) তাঁর মামা।

জানা যায়, ড. মমতাজ উদ্দীন আহমেদ তখন নতুন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার প্রত্যয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষককে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসেন; এরই ফলশ্রুতি এবিএম হোসেন দম্পতির লন্ডন ছেড়ে রাজশাহীতে আসা। প্রফেসর ড. শাহানারা হোসেন ২০১৯ সালে ৩১ আগস্ট তিনি প্রয়াত হন।

বরেণ্য শিক্ষাবিদ, সনৎকুমার সাহা এক লেখায় এ বি এম হোসেন দম্পতির সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। লেখাটি প্রকাশ হয়েছিল শাহানারা হোসেন মৃত্যুর একমাস আগে। সনৎকুমার সাহা বলেন, ‘তাঁকে (শাহানারা হোসেন) প্রথম দেখি ১৯৬০ সালে। একা নন। স্বামী ডক্টর এ. বি. মোশাররফ হোসেনও তাঁর সঙ্গে। দুজনই এসেছেন আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগ দিতে। আমি তখনো ছাত্র। তাঁদের বিষয়ে কিছুই জানি না। কিন্তু চোখে পড়াতেই মুগ্ধ। দুজনেই সাধারণের তুলনায় দীর্ঘদেহী-দিব্যকাস্তি। শাহানারা হোসেন যেন রাজহংসী। লালিত্যের সঙ্গে গাম্ভীর্যের মিশেল। দেবী প্রতিমার মতো। আপনা থেকে মাথা নত হয়। গুণের কথা জেনে অবাক হই আরো। দুজনেই লন্ডন-স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে এসেছেন। এ. বি. এম হোসেন ইসলামের ইতিহাসে ডক্টরেট। আর শাহানারা হোসেন পরে গিয়ে খুব অল্প সময়েই সাধারণ ইতিহাসে এমএ। অবশ্য তার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নজরকাড়া ফল দেখিয়ে যোগ্যতার ছাপ রাখতে পারেন বলেই লন্ডনের সেরা স্কুলে তাঁরা ভর্তি হতে পারেন। শাহানারা হোসেন পরে আবার ওখান থেকে ডক্টরেট করেন। সেটা ১৯৬৬ সালে। ডক্টর এ. বি. এম হোসেন এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর এমেরিটাস। ক’বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ডক্টর শাহানারা হোসেনকেও তাঁদের বিশেষ মর্যাদার ইউজিসি-প্রফেসর পদে বরণ করে তাঁর মেধার প্রতি সম্মান জানান। দুজনই আমাদের অশেষ শ্রদ্ধার। এ. বি. এম হোসেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামিক সংস্কৃতি, বিশেষ করে স্থাপত্যকলার ওপর একজন বিশেষজ্ঞ বলে নন্দিত। শাহানারা হোসেনের অবিসংবাদী দক্ষতা প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে।’ (মাসিক কালি ও কলম, ‘শাহানারা হোসেনের শেষ বেলার পাঁচালী’, ২৩ জুলাই ২০১৯) ।

বরেণ্য ইতিহাসবিদ জ্ঞানতাপস এ বি এম হোসেনের ষাট বছরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা জীবনে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী তাঁর দীক্ষায় সিক্ত হয়েছেন; পরিশুদ্ধ করেছেন নিজকে; আলোকিত মানুষ হয়েছেন। শুধু নিজের বিভাগ নয়, সকল বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কাছেই শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।

স্যারের নগন্য একজন ছাত্র আমি। স্যারের প্রজ্ঞা-জ্ঞানসাধনা, নীতি-আদর্শ ও পাণ্ডিত্যস্পর্শে আমরা চেতনাদীপ্ত । আমাদের মধ্যে প্রগাঢ় অহংকার আছে স্যারের ছাত্র হওয়ার। যে অহংকারের চেতনা আমাদের দেশমাতৃকাকে ভালবাসতে শিখিয়েছে; সত্যনিষ্ঠ করেছে; সত্য-মিথ্যার প্রভেদ শিখিয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি স্যারের সরাসরি ছাত্র হই, ১৯৮৭ সালে জুলাই মাসে। একদিন পরিচিত হতে স্যারের চেম্বারে যাই। ‘নবিয়াবাদ’ গ্রাম বলতেই আমার দিকে স্যার তাকালেন (স্যারের পাশের গ্রাম)। আমি অবাক হয়ে যাই, কারণ আমার আব্বার চেহারার সাথে স্যারের চেহারা যেন হুবহু মিল, তখন আব্বা বেঁচে ছিলেন। স্যার বসালেন, আমার উদ্দেশে পণ্ডিত-উক্তি, ‘শীলভদ্রের নাম শুনেছো, ময়নামতি-পাহাড়পুর-মহাস্থান সম্পর্কে জান।’ শুধু ময়নামতিকে সামান্য জানি, শীলভদ্রের নাম তো শুনিনি। মাথা নিচু করে রাখলাম। হাসিমুখে স্যার বললেন, ‘যাও সন্ধান কর।’ স্যারের অপার স্নেহ কত শিক্ষার্থী যে লাভ করেছেন তার হিসেবে নেই।

পরে জেনেছি, শীলভদ্রের জীবনঘনিষ্ঠ হই। প্রাচীন বাংলার সপ্তম শতকের বিশ্ববিশ্রুত পণ্ডিত শীলভদ্র। শীলভদ্রের জন্ম ৫২২ খ্রি. মৃত্যু ৬৫৪। তিনি প্রাচীন ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ছিলেন। নালন্দায় শীলভদ্রের ছাত্র ছিলেন বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ। শীলভদ্রের আগে এতবড় বাঙালি পণ্ডিতের নাম জানা যায় না। কবিগুরু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ’ প্রবন্ধে পণ্ডিত শীলভদ্রের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। শীলভদ্র সমতটের রাজপরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর বাড়ি কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার কৈলান গ্রামে।

আমি তিন দশকের বেশি শীলভদ্রকে সন্ধান করছি; খুঁজে ফিরছি অন্তহীনভাবে; জীবনভর খুঁজে ফিরবও। ড. এ বি এম স্যারকে আমি শীলভদ্রের সাথেই তুলনা করি। পাণ্ডিত্যে ও মনীষায় তিনি এ যুগের শীলভদ্র।

জ্ঞানতাপস প্রফেসর ড. এ বি এম হোসেন স্যার একজন মহৎপ্রাণ বাঙালি; সাদা মনের মানুষ। বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। সাহসী মানুষ। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রফেসর এ বি এম হোসেন হোসেন দম্পতি সপরিবারে রাজশাহীতেই ছিলেন। তাঁকে একাধিকবার সামরিক বাহিনীর লোকেরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুভয়ে পালিয়ে যাননি।  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। আজীবন তিনি জ্ঞানসাধনা, গবেষণা আর জ্ঞান বিতরণে নিবেদিত ছিলেন। পদ-পদবী তাঁকে তাড়িত করেনি কখনও। স্যার অতিশয় সত্যব্রতী মানুষ। এমন সন্তান জন্ম দিয়ে বাংলা মায়ের স্বর্নজঠরও যেন ধন্য।

লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

admin

Read Previous

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে উপাচার্যের নির্বাহী আদেশ অমান্যসহ তথ্য গোপনের অভিযোগ

Read Next

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বিতর্কিত ভূমিকার কাউকে ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগ কেউই মেনে নেবে না’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *