শিরোনাম:
এবার রাবির নতুন উপ-উপাচার্যকে ঘিরে বিতর্ক রাবির নতুন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম টিপু রাবি প্রশাসনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাউকে দায়িত্ব না দেওয়ার ও দ্রুত ভিসি নিয়োগের দাবিতে মানববন্ধন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শনের চর্চা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বিতর্কিত ভূমিকার কাউকে ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগ কেউই মেনে নেবে না’ ইতিহাসবিদ এ বি এম হোসেন : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবস্তম্ভ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে উপাচার্যের নির্বাহী আদেশ অমান্যসহ তথ্য গোপনের অভিযোগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অফিসারদের উপস্থিতি চোখে পড়ে ‘হ্যাটস অফ টু ইউ স্যার’ ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর তনয়া, দেশরত্ন শেখ হাসিনা আপা, আপনি আস্থা ও ভরসার শেষ ঠিকানা’
১১ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৬শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

এবার রাবির নতুন উপ-উপাচার্যকে ঘিরে বিতর্ক

রাবি সংবাদদাতা:

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) প্রশাসনকে ঘিরে ‘বিতর্ক’ ছাড়ছে ছাড়ছে না। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে নিয়োগসহ নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম টিপুকে নিয়ে এবার নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ১৩ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে বিশ^বিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য পদে অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম টিপুর নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এ নিয়ে তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী’ পরিবারের সদস্য উল্লেখ করে পদত্যাগ দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

এদিকে ১২ জুলাই রাবির উপ-উপাচার্য পদে অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম টিপুকে নিয়োগের খবরে বিবৃতি দিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন রাকসুর সাবেক ভিপি, রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক টিপুর পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী। তিনি বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি বিএনপির হয়ে কাজ করেছেন। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার ভাই রাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর হিসেবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছেন।’ বাদশা আরও বলেন, ‘এমন ব্যক্তির নিয়োগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহীর শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

অন্যদিকে তাঁর নিয়োগের প্রতিবাদে এদিন দুপুরে ক্যাম্পাসের ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক’ চত্বরে ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী’র ব্যানারে সাবেক শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা এই কর্মসূচি পালন করে। মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়, ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অর্থায়নে ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক’ নির্মাণে অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম টিপুর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক আবুল কাশেম তার প্রতিবেদনে অর্থ ব্যয়ে অনিয়মসহ তামার হিসাব না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন।’ এছাড়া স্মৃতিফলক নির্মাণকাজের জন্য বরাদ্দ ৭৬ লাখ ৪৮ হাজার ৪১৫ টাকা কাজ শুরুর আগেই তুলে নেওয়া হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অধ্যাপক সুলতান সে সময় তদন্ত কমিটিকে খরচের ভাউচার দেখাতে পারেননি। স্মৃতিফলকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি নিচে স্থাপন করার কারণে তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকে অবমাননার অভিযোগ পাওয়া যায়।’

এ বিষয়ে রাবির ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ও বিশিষ্ট নাট্যকার বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এমএ বারী সরাসরি পাকিস্তানের দালালি করেছেন। তার ইন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সেই পাকিস্তানি দালাল উপাচার্যের সময়ে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ছিলেন অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম টিপুর বড় ভাই সোলায়মান আলী সরকার। এটা স্পষ্ট, তিনি ওই উপাচার্যের আদর্শে আদর্শিত না হলে এত বড় পদে নিয়োগ পেতেন না। পরে তিনি এই ক্যাম্পাসে জামাতের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।’

এ বিষয়ে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, রাজশাহী মহানগর শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী বরজাহান বলেন, ‘বিতর্কিত একজন লোককে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেক বিশিষ্ট শিক্ষকই রাবিতে রয়েছেন। কিন্তু তাদেরকে না দিয়ে বিতর্কিত একজন শিক্ষককে উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়ায় আমরা মুক্তিযোদ্ধারা লজ্জিত। আমরা এর বিরোধিতা করছি এবং বিতর্কিত এই শিক্ষককে প্রত্যাহার করতে সরকারের নিকট আহ্বান জানাচ্ছি।’

এ ব্যাপারে ১৯৯২ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সাথে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সাথে যারা কাজ করেছেন তাদের একজন অধ্যাপক এসএম আবু বকর বলেন, ‘রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ দেখতে চায়, এজন্য কাজ করেন, তাদের কাছে অধ্যাপক টিপুর নিয়োগ অত্যন্ত কষ্টের ও বেদনাদায়ক। কারণ বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পোসের এসএম হলের পেছনের এশটি ভবন থেকে শিবিরকর্মীরা ক্যাম্পাসের আবাসিক হলগুলোতে আক্রমণ করতো। সেই ভবনটি কার নামে বরাদ্দ ছিল এবং সেখানে কারা থাকতো, সেটা অনুসন্ধান করা উচিত।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম টিপুর বড় ভাই অধ্যাপক সোলায়মান আলী সরকার দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এবং ১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ নভেম্বর এবং ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৪ জুন ১৯৭২ পর্যন্ত দুই মেয়াদে রাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি রাবির আইনশৃঙ্খলা দেখাশোনা করতেন। তিনি তৎকালীন উপাচার্য ও পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক এমএ বারীর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন। এ জন্য উপাচার্য এমএ বারী অধ্যাপক সোলায়মান আলীকে প্রক্টরের দায়িত্ব দেন। অধ্যাপক এমএ বারী জিয়াউর রহমান সরকারের সময় পুনরায় উপাচার্য নিয়োগ পেলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘আমি পরপর তিন মেয়াদে দলীয় শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাবির মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের স্টিয়ারিং কমিটির নির্বাচিত সদস্য ছিলাম। দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে রাবি ক্লাবের ক্যাটারিং সেক্রেটারী ছিলাম। দলের মনোনয়নে রাবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ এবং সদস্যও নির্বাচিত হয়েছি। এমনকি দলীয় প্রার্থী হিসেবে রাবি সিনেটে নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি রয়েছি। কিন্তু এতোদিন তো কেউ আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি? পাল্টা অভিযোগ করে তিনি বলেন, আজকে যারা আমার বিরুদ্ধে অসত্য অভিযোগ তুলছেন, তারাও তো দলের নীতি নির্ধারক ও স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ছিলেন। কেউ তো কোনো দিন এসব বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি। তাহলে আজ কেনো তারা অভিযোগ করছেন?’ বরং বিভিন্ন সময়ে আজকের অভিযোগকারীদের পক্ষেই আমি বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি। গোটা ক্যাম্পাসে এসবের সাক্ষী আছে, বিষয়টি বুঝতে হবে। তিনি বলেন, ‘বলা হচ্ছে, আমি ১৯৯৫ সালে নিয়োগ পেয়েছি। প্রকৃতপক্ষে আমি ১৯৯৭ সালে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ পেয়েছি। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে আমার ৯২টি পাবিলিকেশন রয়েছে। আরও ৬টি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।’ তিনি নিজেকে একজন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক উল্লেখ করে আরও বলেন, তার ভাইকে নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। যা সঠিক নয়।’

উল্লেখ্য, গত ৬ মে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের মেয়াদের শেষ দিন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহাকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়। উপাচর্যের পদশূন্য হওয়ার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো রাবির উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে আগামী ১৬ জুলাই উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। পরদিন ১৭ জুলাই থেকে উপ-উপাচার্যের শূন্যপদে নিয়োগ পেছেন অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে নিয়োগসহ নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগে চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম টিপুকে উপ-উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

 

admin

Read Previous

রাবির নতুন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম টিপু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *