অর্থনীতি
আইন-আদালত
আওয়ামী লীগ
আন্তর্জাতিক
কৃষি
ক্রিকেট
খেলা
জাতীয়
টেলিভিশন
ঢাকা
ঢালিউড
তথ্যপ্রযুক্তি
ধর্ম
ফুটবল
বিএনপি
বিনোদন
মতামত
রাজনীতি
রাজশাহী
লাইফস্টাইল
শিক্ষা
সংসদ
সরকার
সারাদেশ
স্বাস্থ্য
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ট্রাম্পের হুমকিতে কী ক্ষতি হবে জার্মানির?
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ট্রাম্পের হুমকিতে কী ক্ষতি হবে জার্মানির?
দৈনিক রাজশাহী
০৪ মে ২০২৬
জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হতে পারে– এমন হুমকি একাধিকবার দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩০ মে তিনি আবারও এই হুমকি দেওয়ায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
এতে প্রশ্ন উঠছে, জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং ট্রাম্পের হুমকি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহার হলে জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে।
জার্মানিতে মার্কিন সেনা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তথ্য অনুযায়ী ও জার্মানির ডিপিএ পত্রিকার তথ্যমতে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ জার্মানিতে প্রায় ৩৬ হাজার ৪০০ মার্কিন সেনা সদস্য মোতায়েন ছিলেন।
এশিয়ায় জাপানের পর জার্মানিই এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটির দেশ।
এই বিশাল সেনার উপস্থিতি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ও কোল্ড ওয়ারের সময় থেকে।
তখন জার্মানি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। পূর্ব জার্মানি ছিল রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ব্লকে অন্যদিকে পশ্চিম জার্মানি ছিল ন্যাটো নেতৃত্বাধীন ব্লকে।
তখন পূর্ব ইউরোপীয় ব্লক ও রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় পশ্চিম জার্মানিকে রক্ষার জন্য এসব ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে, দুই বিভক্ত জার্মানি একক জার্মানিতে পরিণত হয়েছে তারপরও রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এসব ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এই ঘাঁটিগুলোর অবস্থানের যৌক্তিকতাও তুলে ধরে। ইউরোপের এই সুবিধার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট অঞ্চল থেকে ভৌগোলিকভাবে দূরে অবস্থান করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এসব ঘাঁটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এসব ঘাঁটি থেকে সহজেই রসদ সরবরাহ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা
জার্মানির দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ সামরিক ঘাঁটির অবস্থান। এর মধ্যে অন্যতম হলো রাইনল্যান্ড-প্যালাটিনেট রাজ্যের রামস্টাইন বিমানঘাঁটি, যা যুক্তরাষ্ট্রের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিদেশি বিমানঘাঁটি। একই প্রদেশের ল্যান্ডস্টুলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিদেশি সামরিক হাসপাতাল। বিদেশে আহত মার্কিন সেনাদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা দিতে এই হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে পুরোনো হয়ে যাওয়ায় ল্যান্ডস্টুলের কাছেই ভাইলারবাখ এলাকায় প্রায় ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নতুন আরও একটি আধুনিক সামরিক হাসপাতাল নির্মাণ করা হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সবচেয়ে বড় সেনা হাসপাতাল হবে। এছাড়া বাভারিয়ার গ্রাফেনভেয়ার অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। স্টুটগার্টে ইউরোপ ও আফ্রিকা অঞ্চলের মার্কিন সামরিক কমান্ডের (ইউকোম ও আফ্রিকম) সদর দপ্তর অবস্থিত। এছাড়া হেসেন প্রদেশের ভাইসবাডেনে ইউরোপে মার্কিন স্থলবাহিনীর প্রধান কার্যালয় রয়েছে। রাইনল্যান্ড-প্যালাটিনেটের স্প্যাংডাহলেম বিমানঘাঁটিতে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। এমনকি এই অঞ্চলের বুখেল ঘাঁটিতেই ইউরোপে থাকা আনুমানিক প্রায় ১০০টি মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
রামস্টাইন ঘাঁটি আসলে কী?
ডিপিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউরোপে প্রায় ৬৮ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছিল। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ প্রায় ৩৬ হাজার ৪০০ সেনা জার্মানিতে ছিল। আর এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার সেনা রামস্টাইন ঘাঁটিতে অবস্থান করে। সেনা সদস্যদের পাশাপাশি বেসামরিক কর্মচারী, স্থানীয় কর্মী ও পরিবারের সদস্যসহ রামস্টাইন এলাকায় মোট ৫০ থেকে ৫৫ হাজার মার্কিন নাগরিক বসবাস করেন। রামস্টাইন শুধু একটি সেনা বা বিমানঘাঁটি নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক ও অপারেশনাল কেন্দ্র। এখান থেকে ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে সেনা চলাচল, বিমান পরিবহন, চিকিৎসা সেবা নেওয়া এবং যোগাযোগ ও কমান্ড কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ইরানে আক্রমণের সময়ও এই ঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার পূর্ব ইউরোপের দেশ ইউক্রেন আক্রমণের পর এই ঘাঁটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এই ঘাঁটি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে যেকোনো সময়ে ও দ্রুত সেনা মোতায়েন সক্ষমতার জন্য অপরিহার্য বলে মনে করা হয়।
জার্মানির অর্থনীতিতে প্রভাব
সামরিক ঘাঁটিগুলো জার্মানির কিছু প্রদেশের স্থানীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান, বাসা ভাড়া, সেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এই ঘাঁটিগুলোর অবদান রয়েছে। টাগেচাওর তথ্যমতে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কারণে প্রতি অর্থবছরে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হয়। এতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি, বেতন ও ভাড়ার অর্থ অন্তর্ভুক্ত।
ট্রাম্পের হুমকি কারণ ও প্রতিক্রিয়া
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও জার্মান চ্যান্সেলর মার্সের সম্পর্ক কবে ও কীভাবে স্থিতিশীল হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। দুজনের বাকযুদ্ধ এখনও চলছে। ওয়াশিংটনে এই দুই নেতার প্রথম বৈঠকের পর মার্স আলোচনার পরিবেশকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেছিলেন। ট্রাম্পের পারিবারিক শিকড় জার্মানিতে থাকায় দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সম্ভাবনার কথাও তিনি মাঝে মাঝে বলেন। তবে ইরান ইস্যুতে মতবিরোধের পর ট্রাম্পের বক্তব্যের সুরও পাল্টে গেছে। মার্স বলেছিলেন, বর্তমান এই পরিস্থিতিতে ইরানের নেতৃত্ব উল্টো যুক্তরাষ্ট্রকেই বিব্রত ও লজ্জাজনক অবস্থায় ফেলছে এবং ওয়াশিংটনের সুস্পষ্ট কোনো কৌশল চোখে পড়ছে না। অন্যদিকে ট্রাম্প জার্মান চ্যান্সেলর মার্সের সমালোচনা করে বলেন, তিনি বিষয়টি বোঝেনই না। পাশাপাশি জার্মানির অর্থনৈতিক অবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে ট্রাম্পের হুমকিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন জার্মানির কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চাইলে দ্রুতই সাময়িকভাবে সেনা প্রত্যাহার করতে পারেন। তবে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া স্থায়ীভাবে তা করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে জার্মানদের। জার্মানির সরকার মনে করছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব সরাসরি স্থানীয়ভাবে পড়বে। সীমিত সংখ্যক সেনা প্রত্যাহার হলে তা সাময়িক হতে পারে এবং তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি নাও করতে পারে। তবে বড় সামরিক ঘাঁটি বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব বেশি হবে। এক্ষেত্রে ন্যাটোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবও দুর্বল হয়ে পড়বে কি না সে প্রশ্নও উঠতে পারে। এছাড়া জার্মান সরকার এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। অতীতে ট্রাম্পের অনুরূপ হুমকির সময়ও তারা সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান বাডেফুল বলেছেন, তিনি জার্মানিতে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না। তিনি বলেন, রামস্টাইন, ল্যান্ডস্টুল ও গ্রাফেনভেয়ার এই ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি উভয়ের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভবিষ্যতে সামরিক শক্তির কিছু পুনর্বিন্যাস হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সবমিলিয়ে জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা কেবল সামরিক বিষয় নয়, এটি অর্থনীতি, কূটনীতি এবং ন্যাটো জোটের ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
শেয়ার করুন