রামেবি ভিসির বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
রামেবি ভিসির বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) প্রফেসর ডা. মোঃ জাওয়াদুল হকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তার অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অঢেল সম্পদ অর্জনের বিষয়টি তদন্তপূর্বক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (সচিব) এবংসমন্বিত জেলা কার্যালয়, রাজশাহী বরাবরে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
সম্প্রতি ওই অভিযোগের একটি কপি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এতে ভিসি ডা. জাওয়াদুল হকের অঢেল সম্পদ ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে তদন্ত পূর্বক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অুনরোধ জানিয়েছেন রাজশাহী মোহনপুরের আব্দুল হান্নান।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক শুরু থেকেই ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, ইউজিসির নির্দেশনা ও সরকারি বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে পদে পদে অনিয়ম-দুর্নীতি করে আসছেন। তিনি প্রাইভেট প্র্যাকটিস বিহীন কমিউনিটি মেডিসিনের চিকিৎসক। তার স্ত্রী একজন সাধারণ গৃহিণী। তিনি মোটা অংকের টাকা খরচ করে দুই ছেলেকে ডাক্তারি পড়িয়েছেন। তারপরও স্ত্রী এবং নিজের নামে অঢেল সম্পত্তি গড়েছেন কিভাবে তা তদন্তের দাবি রাখে।
জানামতে, তার বিরুদ্ধে রাজশাহীর উপশহর হাউজিং স্টেটের ৩ নং সেক্টরের ২৪ নং ভবনের ৫ এর ‘এ’ এবং ‘বি’ দুইটি ফ্ল্যাট, রাজশাহীর চন্দ্রিমা আবাসিকে ৩ নং রোডের ১১৮/৭ নং হোল্ডিংয়ের ছয়তলা বিশিষ্ট বাড়ি, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বাজে সিলিন্দা ও বারুইপাড়া মৌজায় ১৫ কাঠা জমি, রাজশাহীর বনলতা আবাসিক এলাকায় যৌথ ফ্ল্যাট, ঢাকার মিরপুর-১৩ এর বিজয় র্যাকিন সিটির ৫ নং ভবনে একটি ফ্ল্যাটসহ নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র মতে, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্নীতির নেপথ্যের কারিগর বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরপরই ২০১৮ সালে তিনি অবৈধভাবে ডিন, একাই ৭টি গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলসহ ৬৯ পরিদর্শন কমিটির আহবায়ক হয়ে দুর্নীতির আতুর ঘরে পরিণত করেন বিশ্ববিদ্যায়টিকে। তখন থেকেই তার বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করে। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসারী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) পতাকাতলে গিয়ে নিজের অপকর্ম আড়াল করেন তিনি।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তিনি খোলস পাল্টিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ ভিসি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ভিসি পদে বসেই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ও সরকারি বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে ৯ম গ্রেডের সেকশন কর্মকর্তা নাজমুল হোসেনকে ৫ম গ্রেডের পিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ তিন পদে বসান। এরপর অনুগত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের রেজিস্ট্রার, কলেজ পরিদর্শক, পরিচালকসহ বিভিন্ন উচ্চ পদে বার বার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং ডিন পদে নিয়োগ দিয়ে দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন তিনি।
সূত্র মতে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির (৬/১০/২০২৫) বিভিন্ন পদের আবেদনে অতিরিক্ত ফি আদায় করে ফেরত দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ প্রার্থীদের দিয়ে নিয়োগের কাজ করানো, অবৈধ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কলেজ পরিদর্শক পদের অভিজ্ঞতা শিথিলসহ শুধুমাত্র চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শুরুতেই অনিয়ম করেন বর্তমান ভিসি।
সূত্র জানায়, টেন্ডার ছাড়াই রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের সহস্রাধিক গাছ বিক্রি, পুকুর ও ফসলের জমি লিজ, দোকান ভাড়াসহ কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ আত্মসাত করেছেন ভিসির সিন্ডিকেট। প্রজেক্টের সম্পদ লুটের পর ভিসি হাজার কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্য শুরু করেন। ৭৭৭ কোটি টাকার ৫টি অবকাঠামো নির্মাণের টেন্ডার পছন্দের ঠিকাদারকে দেওয়ার জন্য পিপিআর লঙ্ঘন করে ক্রয় পরামর্শক এবং ইতিপূর্বে টেন্ডার সংক্রান্ত দুদকের একাধিক মামলা চলমান থাকা রেয়াজাত হোসেন রিটুকে মূল্যায়ন (টেক) কমিটির সদস্য করেছেন ভিসি। এসব টেন্ডারের জন্য ভিসির বিরুদ্ধে ৯% ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন জনৈক ঠিকাদার।
এদিকে, ভিসির বিভিন্ন অীনয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ এবং তার অপসারণের দাবিতে ৪/০৩/২০২৬ তারিখে মানববন্ধন করেন সচেতন রাজশাহীবাসী। এরপর ১০/০৩/২০২৬ তারিখে জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন রাজশাহী জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন। বিভিন্ন উচ্চপদে অবৈধ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে বেতন ভাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা এবং ৬/১০/২০২৫ তারিখে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিলের জন্য ২৩/১১/২০২৫ তারিখে লিগাল নোটিশ প্রদান করেন চাকরী প্রার্থী আব্দুল মাজেদ। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন তার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এখনও তিনি অবৈধ নিয়োগ, টেন্ডার বাণিজসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন, যোগ্য চাকরী প্রার্থীরা বঞ্চিত এবং মানসম্মত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিধায়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ডা. মোঃ জাওয়াদুল হকের পদে পদে অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অঢেল সম্পদের তদন্তপূর্বক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয় দুদকের কাছে।
এ বিষয়ে মতামতের জন্য রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ডা. জাওয়াদুল হকের সাথে মোবাইলে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।