লাখ লাখ টাকা নয়, দক্ষতাই হতে পারে জার্মানিতে আপনার ভবিষ্যতের চাবিকাঠি

দৈনিক রাজশাহী প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৬ এএম আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ১০:৫২ এএম ৫৪ বার পঠিত
লাখ লাখ টাকা নয়, দক্ষতাই হতে পারে জার্মানিতে আপনার ভবিষ্যতের চাবিকাঠি

লাখ লাখ টাকা নয়, দক্ষতাই হতে পারে জার্মানিতে আপনার ভবিষ্যতের চাবিকাঠি

দৈনিক রাজশাহী
০৫ জুল ২০২৬

মো. শহিদুল ইসলাম

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা বিদেশে কর্মসংস্থানের কথা উঠলেই অনেকের মনে প্রথমেই আসে -‘লাখ লাখ টাকা লাগবে’, ‘আইইএলটিএস না থাকলে সম্ভব নয’, কিংবা ‘শুধু ধনীদের পক্ষেই বিদেশে যাওয়া সম্ভব।’ বছরের পর বছর ধরে এমন ধারণাগুলো আমাদের সমাজে এতটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে অসংখ্য মেধাবী তরুণ-তরুণী নিজের স্বপ্ন শুরু হওয়ার আগেই থামিয়ে দেয়।

কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এমন? না। ইউরোপের অন্যতম শিল্পোন্নত দেশ জার্মানি বর্তমানে দক্ষ জনশক্তির তীব্র সংকটে রয়েছে। অফিসে, স্বাস্থ্যসেবা, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল, আইটি, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, নির্মাণ, লজিস্টিকসসহ বহু খাতে প্রতিবছর হাজার হাজার দক্ষ কর্মীর প্রয়োজনজন হচ্ছে। এই চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য জার্মানি তৈরি করেছে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একই সঙ্গে শেখা, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন এবং মাসিক ভাতা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এটি কেবল একটি প্রশিক্ষণ নয়; বরং দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলার একটি বাস্তব পথ।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো-এই যাত্রা শুরু করতে সবসময় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়না। বরং প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, উপযুক্ত প্রস্তুতি, ভাষাগত দক্ষতা এবং নির্ভুল তথ্য।

বাংলাদেশে অনেক তরুণ মনে করেন বিদেশে যেতে হলে আগে কোটি টাকার সম্পদ থাকতে হবে। বাস্তবে জার্মানির অনেক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা প্রশিক্ষণকালেই মাসিক ভাতা পান। অনেক ক্ষেত্রে আবাসন বা আবাসন-সহায়তার ব্যবস্থাও থাকে, যা শিক্ষার্থীর আর্থিক চাপ কমিয়ে দেয়। প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করার পর পূর্ণকালীন চাকরির সুযোগও তৈরি হয়। অর্থাৎ এখানে শুধু পড়াশোনা নয়, শেখার পাশাপাশি আয় এবং পরবর্তীতে স্থায়ী ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো-বিদেশে যেতে হলে অবশ্যই আইইএলটিএস থাকতে হবে। বাস্তবে জার্মানির বহু প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসূচিতে ইংরেজির পাশাপাশি জার্মান ভাষার দক্ষতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জার্মান ভাষার নির্ধারিত স্তর অর্জন করাই আবেদন প্রক্রিয়ার মূল শর্ত হয়ে থাকে। এ কারণেই আজকের বাস্তবতা হলো-শুধু একটি সার্টিফিকেট নয়, একজন তরুণের প্রকৃত দক্ষতা, কাজের মানসিকতা এবং ভাষাগত প্রস্ততিই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

বর্তমানে আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে ভুয়া তথ্য ও অসাধু দালালচক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন দেখা যায়-'গ্যারান্টি ভিসা', 'এক মাসে জার্মানি', 'কোনো যোগ্যতা লাগবে না'-এ ধরনের প্রলোভনে পড়ে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে শর্টকাট বলে কিছু নেই। প্রতিটি ধাপেই রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম, যোগ্যতা, নথিপত্র, ভাষাগত প্রস্তুতি এবং যাচাই-বাছাই। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা এবং পেশাদার পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো -দশে বসেই নিজেদের প্রস্তত করা সম্ভব। জার্মান ভাষা শেখা, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন, আন্তর্জাতিক মানের জীবন বৃত্তান্ত (সিভি) তৈরি, মোটিভেশন লেটার লেখা, সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি এবং আবেদন প্রক্রিয়া-সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকেই শুরু করা যায়। 

আজকের বিশ্বে সফলতার মূলধন শুধু অর্থ নয়; দক্ষতা। আর সেই দক্ষতাই একজন তরুণকে আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যায়। যদি আপনার লক্ষ্য হয় জার্মানিতে পড়াশোনা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন, কাজ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়া, তাহলে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা। ভুল তথ্য, গুজব কিংবা দালালচক্রের প্রলোভনের ওপর নয়,সরকারি নীতিমালা, বাস্তব যোগ্যতা এবং পেশাদার দিকনির্দেশনার ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করুন। আপনার স্বপ্নের যাত্রা শুরু হতে পারে আজই। হয়তো লাখ লাখ টাকা দিয়ে নয়, বরং নিজের দক্ষতা, সঠিক প্রস্তুতি এবং একটি সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।

যারা জার্মানিতে পড়াাশোনা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন, আবেদন প্রক্রিয়া, ভাষা প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে বিস্তারিত জানতে চান, তারা অভিজ্ঞ ও পেশাদার পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। সঠিক তথ্যই পারে আপনার সময়, অর্থ এবং ভবিষ্যৎ , তিনটিই সুরক্ষিত রাখতে।

লেখক : নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গবেষক।
মোবাইল : ০১৭১৬৪৯৭২২৭

 

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।