ভারতীয় সীমান্তবর্তী পদ্মার চরে যাতায়াতের পাঁচটি ফেরিঘাট মাদক পাচারের নিরাপদ রুট!
ভারতীয় সীমান্তবর্তী পদ্মার চরে যাতায়াতের পাঁচটি ফেরিঘাট মাদক পাচারের নিরাপদ রুট!
ভারতীয় সীমান্ত এলাকার রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মা নদীর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাট দুই বছর ধরে বেদখল হয়ে আছে। রাজস্ব আয়ে এবং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম, ইজারা দিতে পারছে না জেলা পরিষদ। ফেরিঘাটগুলো স্থানীয় প্রভাবশালীরা ইচ্ছেমত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ফলে দুই বছরে পাঁচটি ফেরিঘাট থেকে সরকার প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ বলছে, ব্রিটিশ আমলে চালু ফেরি বা খেয়াঘাটগুলো হচ্ছে-প্রেমতলী, বিদিরপুর, ফুলতলা, রেলবাজার, হাটপাড়া, ভগবন্তপুর ও সুলতানগঞ্জ। তবে দুই বছর পর এবার শুধু সুলতানগঞ্জ ফেরিঘাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ফেরিঘাটগুলো দখলে নিয়েছেন আন্দোলনকারী বিভিন্ন পক্ষের লোকজনেরা। ইজারাদারদের বিতাড়িত করে তারা নিজেরাই টোল আদায় করেন। সেই ধারা অব্যাহত রেখেই এবার তারা ফেরিঘাটগুলোর ইজারা প্রথা বিলুপ্তির দাবিতে নতুন আন্দোলন শুরু করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ছয়টি ফেরিঘাট ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ইজারা থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় পৌনে ৪ কোটি টাকা। এরপর দুই বছর আর ইজারা দিতে পারেনি রাজশাহী জেলা পরিষদ। ২০২৪ সালের আগস্টের পর এলাকাবাসীর ব্যানারে ইজারা ব্যবস্থা বিলুপ্তির আন্দোলন শুরু হয়। ফলে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার আজিম উদ্দিন খন্দকার ইজারা বন্ধের নির্দেশ দেন। চলতি বছর ইজারা প্রক্রিয়া শেষ না হতেই উচ্চ আদালতে রিট করে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ- ভারতীয় সীমান্তবর্তী ঘাটগুলো মাদক পাচারের নিরাপদ ও জনপ্রিয় রুট। ঘাটগুলো ইজারা হওয়ায় প্রশাসনের চাপে মাদক চোরাচালান কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু দুই বছর ঘাটগুলোর কোনো ইজারাদার না থাকায় মাদক পাচারের মুক্ত গেটওয়ে হয়ে উঠেছে। যারা যেমনভাবে পারছে নদী পাড়ি দিচ্ছে। রাতদিনের কোনো ফারাক নেই। দূর্গম এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও মাদক পাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ঈশা গণমাধ্যমকে বলেন, দুই বছর গোদাগাড়ীর পাঁচটি ফেরিঘাট থেকে এক টাকাও পাওয়া যায়নি। ঘাটগুলো ইজারা দিতে বারবার চেষ্টা করেও সম্ভব যায়নি। এখন একটি রাজনৈতিক দলের লোকেরা উচ্চ আদালতে রিট করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন- কখনো বৈষম্যবিরোধী, আবার কখনো জুলাইযোদ্ধা, আবার কখনো এলাকাবাসী ছাত্র-কর্মজীবী জোটের ব্যানারে আন্দোলনের মাধ্যমে ফেরি বা খেয়াঘাটগুলো ইজারার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। এখনও তারা তৎপরতা চালাচ্ছেন। এর পেছনে এলাকাবাসীর সুবিধার চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলই প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। বিভাগীয় কমিশনার পাঁচটি ফেরিঘাটের ইজারা বিলুপ্তির সুপারিশ পাঠিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে দিয়েছে।
এদিকে, কয়েক কোটি টাকায় ইজারা নিয়েও ইজারাদাররা ঘাট পরিচালনা করতে পারেননি। তারা পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। জেলা পরিষদও তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চর আলাতুলি ইউনিয়ন পরিষদ দুটি মূল ভূখণ্ড থেকে পদ্মা নদীর কারণে বিচ্ছিন্ন। কৃষির জন্য উর্বর পদ্মার চরের গ্রামগুলো জনবহুল। ইজারাদার না থাকায় এলাকাবাসীর যাতায়াতে চরম ভোগান্তি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ মহলটি নিজেদের নৌকায় করে যাত্রী পারাপার করছেন। তারা যাত্রী, এলাকাবাসীর নিকট থেকে ভাড়াও আদায় করছেন। চলতি বছরে আদায় করা একটি টাকাও জেলা পরিষদে জমা দেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে উর্বর কৃষি যেমন আছে তেমনি এলাকাটি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের অন্যতম প্রধান রুটও। পর্যাপ্ত নৌকা বা জলযান না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্বাধীনভাবে চরাঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারে না। ফলে প্রতিবেশি ভারত থেকে মাদক কারবারীরা মাদক এনে নৌকায় রাতের আঁধারে অবাধে মাদক চোরাচালান করে। ভারতের কাঁটাতারের বেড়া মাদক চোরাচালানের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয় বলে জানিয়েছে ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো।
রাজশাঞী জেলা পরিষদ প্রশাসক, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ঈশা গণমাধ্যমকে বলেন, জনসাধারণের যাতায়াতের সুবিধার্থেই ফেরিঘাট। ফেরিঘাটগুলো সরকারি সম্পদ। সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত। ঘাটগুলো বিলুপ্ত করার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি আইনের আলোকে সমাধান করা হবে।