শোক-শ্রদ্ধায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তসিকুল ইসলাম রাজা
শোক-শ্রদ্ধায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তসিকুল ইসলাম রাজা
শেষ বিকেলের আলোটা যেন আজ অন্যরকম- ম্লান, ভারী, আর অশ্রুসিক্ত। রাজশাহী মহানগরীর লক্ষীপুর ভাটাপাড়া ঈদগাহ ময়দানে বুধবার (২০ মে) বাদ আছর অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজশাহী শাহমখদুম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, রাজশাহী এসোসিয়েশনের ও রাজশাহী লেখক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. তসিকুল ইসলাম রাজার জানাজার নামাজ। তাকে জানাজার নামাজ শেষে মহিষবাথান গোরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজার মাঠজুড়ে ছিল নিঃশব্দ কান্নার এক গভীর স্রোত। কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়- তবু সেই ভিড়ের মাঝেই এক অদ্ভুত শূন্যতা। কেউ চুপচাপ চোখ মুছছেন, কেউ দূরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না- প্রিয় মানুষটি আর নেই। অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় ফুঁপিয়ে কাঁদতে; কেউ বলছিলেন,“স্যার আমাদের শুধু পড়াননি, মানুষ হতে শিখিয়েছেন।”
জানাজার আগে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য সবার দৃষ্টি কাড়ে- পরিবারের সদস্যরা যখন শেষবারের মতো তাঁর মুখ দেখেন, তখন চারপাশে কান্নার রোল পড়ে যায়। পুত্র সাফিন ইসলাম বারবার নিজেকে সামলে নিতে চেষ্টা করছিলেন, কন্যা ফাতিমাতুজ জোহরা সেঁওতি অশ্রু সংবরণ করতে পারছিলেন না। ছোট নাতির নিষ্পাপ প্রশ্ন-“দাদু কোথায় যাবে?”শুনে উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি লুকাতে পারেননি।
জানাজার ময়দান ছেড়ে যখন মানুষজন ফিরছিলেন, তখন কারও চোখ শুকনো ছিল না। সূর্যটা ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছিল, আর সেই আলোয় যেন ভেসে উঠছিল একটাই সত্য- একজন মানুষ চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর স্পর্শ, তাঁর শিক্ষা, তাঁর সাহস আর ভালোবাসা রয়ে গেছে অগণিত মানুষের হৃদয়ে—অশ্রুভেজা স্মৃতির মতো চিরদিন।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহা. সবুর আলী সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁদের উপস্থিতিও যেন এই বিদায়ের গভীরতাকে আরও ভারী করে তোলে।
এর আগে, সোমবার (১৮ মে) রাত ৮টার দিকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন ড. তসিকুল ইসলাম রাজা (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, অসুস্থ অবস্থায় তিনি ঢাকায় ছেলের বাসায় ছিলেন। তাঁর মেয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পর মরদেহ রাজশাহীতে আনা হয়। জানাজার নামাজ শেষে মহিষবাথান গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়- চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি সেই মাটিতেই, যেখানে তাঁর শিকড়। ড. তসিকুল ইসলাম রাজা ছিলেন একাধারে প্রতিবাদী কবি, নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ও অসাধারণ সংগঠক। আধুনিক বাংলা কবিতা, ফোকলোর, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর গভীর গবেষণা তাঁকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা। তিনি ছিলেন নিরলস কলমসৈনিক- মুক্তচিন্তার এক সাহসী কণ্ঠস্বর। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টিরও বেশি এবং শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সাময়িকীতে। সাহিত্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেছেন বহু সম্মাননা ও পুরস্কার, যার মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমির সা’দাত আলী আকন্দ সাহিত্য পুরস্কার (২০২১), রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা (২০২২)সহ আরও অনেক।
১৯৫৩ সালের ১১ জানুয়ারি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বালিয়াঘাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে ভারতের রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৩ সালে শাহমখদুম ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে ২০১৩ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।