১৭ বছরেও দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ হয়নি

অনলাইন ডেস্ক : প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ০৮:৪৬ এএম আপডেট : ২৪ মে ২০২৬, ০২:২৫ পিএম ২৭ বার পঠিত
১৭ বছরেও দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ হয়নি

১৭ বছরেও দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ হয়নি

দৈনিক রাজশাহী
২৪ মে ২০২৬

বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি
 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার ১৭ বছর পরও দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন হয়নি। বিশেষ করে অধিকাংশ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই কমিটি নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগ কার্যকর নয়। ইউজিসির সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর যৌন হয়রানি প্রতিরোধসংক্রান্ত কমিটির কাজে গতি নেই। ইউজিসিরও এ-সংক্রান্ত কমিটি পুনর্গঠন হয়নি।

অবশ্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি করার বিষয়ে তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে এখনো কমিটি হয়নি, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে প্রথম যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা, অভিযোগ ও তদন্ত সেল গঠনের দাবি ওঠে। পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) টিএসসিতে এক তরুণীকে বিবস্ত্র করার ঘটনায় দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠলে এ বিষয়ে রুল দেন হাইকোর্ট। ২০০০ সালে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) পক্ষে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ছয় বছর পর হাইকোর্ট ঢাকা সিটি বিশেষ করে ঢাবি এলাকায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনসহ একাধিক নির্দেশনা দেন। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিএনডব্লিউএলএ ২০০৮ সালে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নতুন করে দিকনির্দেশনা চেয়ে রিট করে। এরপর ২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট ‘যৌন হয়রানি’র সংজ্ঞা নির্ধারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনসহ একাধিক নির্দেশনা দেন।

ওই রায়ে বলা হয়েছিল, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটিতে কমপক্ষে পাঁচজন সদস্য থাকবেন। কমিটির বেশির ভাগ সদস্য হবেন নারী এবং প্রধানও হবেন নারী। প্রতি শিক্ষাবর্ষের পাঠদান কার্যক্রমের শুরুতে এবং প্রতি মাসে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৪-এর তথ্য বলছে, দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪৪ হাজার ৫৭৩টি। এর মধ্যে বেসরকারি ৪১ হাজার ৮৪৫টি এবং সরকারি ২ হাজার ৭২৮টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ জন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো ওই রায়ের ১৭ বছর পরও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এই কমিটি হয়নি। আবার যেগুলোতে হয়েছে, সেসব কমিটির বেশির ভাগই কার্যকর নয়। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির শিকার হলে কমিটির বিষয়টি সামনে আসে। কিছুদিন পর আবার চাপা পড়ে যায়।

হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি  বলেন, ‘গ্রাম অঞ্চলের কথা বাদই দিলাম, রাজধানী এবং জেলা শহরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোনো কমিটি নেই। আদালতের নির্দেশনার এত দিন পরও বিষয়টি কার্যকর না হওয়া হতাশাজনক।’ তিনি এই কমিটি না হওয়ার জন্য দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা দায়ী বলে মনে করেন। তিনি বলেন, এখন শিক্ষা প্রশাসনের উচিত নিয়মিত মনিটরিংয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা। তাঁর আশা, এতে কমিটি গঠনের বিষয়টি গতি পাবে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ২৭ মে মাউশির আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর নতুন করে ছয় দফা নির্দেশনা জারি করা হয়। এসব নির্দেশনার মধ্যে ছিল নারী প্রধানসহ পাঁচ সদস্যের কমিটি, অভিযোগ বাক্স স্থাপন, অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের পরিচয় গোপন রাখা, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সৎ, দক্ষ এবং সক্রিয় সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া, ৩০ দিনের মধ্যে সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া এবং কমিটিতে বাইরের দুজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা।

সূত্র জানায়, আদালতের নির্দেশনার পর কমিটি গঠন ছাড়াও যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়াসংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা তৈরি করে মাউশি। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট এই নির্দেশিকা অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত এ নির্দেশিকা অনুমোদন হয়নি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির সর্বশেষ অবস্থার বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল গত শুক্রবার  বলেন, ‘কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি রয়েছে। তবে অনেক জায়গায় এখনো হয়নি। বিষয়টি আমি সম্প্রতি জেনেছি। এরপর মাউশির ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম (ডিএমএস) অ্যাপে এ-সংক্রান্ত একটি সূচক যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে মনিটরিংয়ের সময় সহজেই দেখা যায় কোন কোন প্রতিষ্ঠানে এ-সংক্রান্ত কমিটি হয়নি।’ তিনি বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধসংক্রান্ত নির্দেশিকা দ্রুত অনুমোদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত বিষয়াবলি নিয়মিত মনিটরিং করা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকেও অধীনের অফিস এবং সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে অফিসগুলোতে কমিটি হলেও অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হয়নি। সাধারণত উপজেলা অফিস থেকে স্কুলপর্যায়ে এ ধরনের ঘটনা তদারকি করা হয়।

জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (তদন্ত ও শৃঙ্খলা) মো. আব্দুস সালাম  বলেন, এ দপ্তরের অধীন সব অফিসে কমিটি গঠনের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

একই অবস্থা মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি থাকলেও বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তা হয়নি।

জানতে চাইলে গতকাল শনিবার কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) প্রকৌশলী মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, কমিটি করার বিষয়ে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে বর্তমান অবস্থা কী, তা খোঁজখবর নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি, পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন নেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সূত্রে জানা যায়, দেশে স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বর্তমানে মোট ১৭৪টি। এর মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন কারণে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিত রয়েছে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি হয়েছে ১৪২টিতে। এর মধ্যে ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ৯৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কমিটির কার্যপরিধি অনুযায়ী ছয় মাস পরপর ইউজিসিতে প্রতিবেদন আকারে তথ্য পাঠানোর কথা। কিন্তু অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রতিবেদন পাঠাচ্ছে না। যেসব প্রতিবেদন আসছে সেগুলোতেও তথ্য অসম্পূর্ণ। অভিযোগের কোনো পূর্ণাঙ্গ বিবরণ বা কী শাস্তি দেওয়া হলো বা বর্তমানে সেসব অভিযোগের অবস্থা কী, সেসব প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকে না।

ইউজিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগরসহ পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই প্রতিবেদনের বিষয়ে বেশি উদাসীন। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি থাকলেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য ইউজিসিতে পাঠানো হয় না। কর্মশালা এবং নবীনবরণ অনুষ্ঠানেও এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জানানো হয় না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধসংক্রান্ত কমিটির কাজে গতি নেই। ইউজিসির এ-সংক্রান্ত কমিটিও পুনর্গঠন করা হয়নি।

জানতে চাইলে ইউজিসির পরিচালক (আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগ) জেসমিন পারভিন বলেন, আগামী জুন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থায়নে যৌন হয়রানি সচেতনতা সংক্রান্ত একটি প্রকল্প চালু হবে। এ প্রকল্পের অধীনে বেশ কিছু মনিটরিং টুল তৈরি করা হবে। এ ছাড়া হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো মানার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।