ঈদের ছুটিতে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ৭৯: বেশি মৃত্যু মোটরসাইকেলে

অনলাইন ডেস্ক : প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ১১:২৩ এএম আপডেট : ০১ জুন ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম ২৪ বার পঠিত
ঈদের ছুটিতে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ৭৯: বেশি মৃত্যু মোটরসাইকেলে

ঈদের ছুটিতে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ৭৯: বেশি মৃত্যু মোটরসাইকেলে

দৈনিক রাজশাহী
০১ জুন ২০২৬

পবিত্র ঈদ-উল আজহার ছুটিতে ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাত দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৯ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৩৫ জন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার সড়কে ৩২টি দুর্ঘটনায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়।

মৃতদের মধ্যে কেউ ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফিরছিলেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বের হয়েছিলেন। আবার বাস, ট্রাক কিংবা অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষ ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যাওয়ার ঘটনাতেও প্রাণহানি ঘটেছে। শুধু ছুটির শেষ দিন শনিবারই সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু এবং অন্তত ৭৮ জন আহত হয়েছেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ১৫টিই ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩২ জন, যা মোট প্রাণহানির প্রায় ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদকে কেন্দ্র করে লাখো মানুষের বাড়ি ফেরা, মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, মোটরসাইকেলের বাড়তি চলাচল এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাই দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

ছুটির শেষ দিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নেত্রকোনার সদর উপজেলার চল্লিশা এলাকায় বাসচাপায় ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের তিন যাত্রী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন এক মা ও তাঁর দুই মেয়ে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় এক বৃদ্ধ নিহত হন। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান এক তরুণী। কুষ্টিয়ার মিরপুরে যাত্রীবাহী বাস ও সেনাবাহিনীর সদস্যবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অন্তত ৩২ জন আহত হন।

এ ছাড়া গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বাস খাদে পড়ে এক নারী নিহত ও অন্তত ১০ জন আহত হন। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে দুটি বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে এক নাইটগার্ড নিহত হন। একই জেলার ফরিদগঞ্জে পিকআপ ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে প্রাণ হারায় এক কিশোর।

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে অন্তত ৩০ জন আহত হন। বগুড়ার শেরপুরে যাত্রীবাহী বাসের চাপায় নিহত হন সাইকেলচালক আলহাজ উদ্দিন। সিলেটের ওসমানীনগরে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে পেছন থেকে আরেকটি বাসের ধাক্কায় চালক ও তাঁর সহকারী ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

ঈদযাত্রার শুরুতেই ২৫ মে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ শ্রমিক নিহত হন। ছুটিকালীন সময়ের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

একই দিন বগুড়ার শাজাহানপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ব্র্যাকের এক কর্মী ও তাঁর চার বছরের মেয়ে নিহত হন। নওগাঁর পত্নীতলায় ডাম্প ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে ইজিবাইকের চালকসহ দুজনের মৃত্যু হয়।

পরদিন ২৬ মে কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে চালবোঝাই পিকআপের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে একই পরিবারের তিনজন নিহত হন। বরিশালের গৌরনদীতেও বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেলে থাকা একই পরিবারের তিন সদস্য প্রাণ হারান। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বাসচাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার তিন যাত্রী নিহত হন।

ঈদের দিন মৃত ১৮

২৭ মে রাজধানীর নদ্দা নতুন বাজার এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি বাস সড়ক বিভাজক ভেঙে অপর একটি বাসে ধাক্কা দিলে চারজন নিহত এবং ১০ জন আহত হন। একই রাতে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই চালক নিহত হন।

ঈদের দিন ২৮ মে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বেদগ্রামে বাস ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হন। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ধাক্কা দিলে দুই শিশু নিহত হয়। নরসিংদীর শিবপুরে দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে প্রাণ হারান দুই তরুণ।

পটুয়াখালীর গলাচিপায় অটোরিকশার সঙ্গে সংঘর্ষে মোটরসাইকেলে থাকা দুই কিশোর নিহত হয়। বগুড়ার শেরপুরে তিন মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে দুই তরুণ নিহত এবং চারজন আহত হন। টাঙ্গাইলের সখীপুরে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী নিহত হন। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বাস ও লেগুনার সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু হয়।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে

২৯ মে ঝিনাইদহ শহরে ট্রাফিক পুলিশের তল্লাশিচৌকি দেখে পালাতে গিয়ে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। একই দিন বগুড়ার কাহালুতে দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়।

৩০ মে ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও পিকআপের সংঘর্ষে বাবা ও তাঁর শিশুপুত্র নিহত হন। নরসিংদীর শিবপুরে প্রাইভেট কারের সঙ্গে সংঘর্ষে অটোরিকশার চালকসহ দুজন নিহত হন। ঈশ্বরগঞ্জে মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে এক তরুণ এবং চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছে ধাক্কা দিলে দুই বন্ধু প্রাণ হারান।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কেবল ঈদকেন্দ্রিক তৎপরতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ‘সেফটি কালচার’ বা নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-এর অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মো. হাদিউজ্জামান।

তিনি বলেন, সারা বছর সড়কে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম চলতে দিয়ে শুধু ঈদের সময় সতর্কতা জারি করে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে এটি অভ্যাস ও সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে।

তাঁর মতে, গণপরিবহনের সংকট ও ভাড়া নৈরাজ্যের কারণে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেলকে যাতায়াতের বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাব, অতিরিক্ত গতি এবং ঈদের পর প্রশাসনিক নজরদারি কমে যাওয়ায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

সড়কে চাপ কমাতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা নিরুৎসাহিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেলপথের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।