নাটোরের বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১২, আহত ৩২

অনলাইন ডেস্ক : প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম ১২ বার পঠিত
নাটোরের বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১২, আহত ৩২
বনপাড়ায় ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতদের লাশের সারি | ছবি: দৈনিক রাজশাহী

নাটোরের বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১২, আহত ৩২

দৈনিক রাজশাহী
২০ অক্টো ২০২৬

‘চালক গাড়ি চালানোর সময় ঘুমাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে গাড়ি বাম দিক থেকে ডানে গিয়ে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এরপর চেতনা ফিরলে দেখি কয়েকজন আমার মোবাইল, মানিব্যাগ নিয়ে যাচ্ছে।’ এভাবেই  দুর্ঘটনার বর্ণনা দেন মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে বেঁচে যাওয়া আহত যাত্রী সোহেল রানা। 

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর কিছু মানুষ যাত্রীদের মালামাল লুট শুরু করেন। বাসের মধ্যে আটকে থাকায় আমরা কিছু্ই বলতে পারছিলাম না। তবে কিছু মানুষ আহতদের উদ্ধারের জন্য ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সহযোগিতাও করেন।’

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র এলাকায় এ ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘনা ঘটে বলে জানান নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক। এ ঘটনায় বাবা-মেয়েসহ ১২ জন নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩২ জন।

নিহতরা হলেন- রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ারুল হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিধখালী গ্রামের আজহার হাওলাদারের ছেলে শহীদুল ইসলাম (৪৫) ও তার মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮), শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের জহরউদ্দিনের ছেলে জুয়েল (৪০), একই উপজেলার ডুবি সাহিবর গ্রামের ইউনুস আলী শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০), জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে আব্দুস সালাম মোল্লা (৪৬), আরব আলী ফকিরের ছেলে আব্দুস সামাদ ফকির (৭০), পালের চর গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহীন আহমেদ (৩২), ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বড় মান্দারবাড়ীয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে ট্রাক চালক আবু কালাম (৫৫), নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে রাসেল (৩৩) এবং ফরিদপুর সদর উপজেলার বাখোন্দিয়া গ্রামের অমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেশ জমাদার (৩৫)।

আহত যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে, তারা হলেন- শরীয়তপুরের আলমগীর মাতবর (৫৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুস সালাম (৩৫), শিবগঞ্জের ওয়াহিদ আলী (২২), মাদারীপুরের নাইম তালুকদার (২০), নার্গিস আক্তার (৩৫), বরগুনার জেসমিন আক্তার (৩৫), নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার চিরঞ্জিত কুমার (২৫), মান্দা উপজেলার মানিক হোসেন (৩৭), শাহাজুল ইসলাম (৩৬), লক্ষ্মীপুর জেলার রাকিব হোসেন (২৫)। অন্য পরিচয় জানা যায়নি।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, ভোরে নাটোর থেকে বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে চাঁপাইনাবগঞ্জগামী যাত্রীবাহী আরপি স্পেশালের একটি বাস মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। আহতদের উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। তবে আহতদের মধ্যে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে বলে জানিয়েছেন তিনি।

নাটোর ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আক্তার হামিদ বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

দুর্ঘটনার পর হতাহতদের মালামাল লুট

বাসের আহত যাত্রী রাকিব হোসেনসহ আরও কয়েকজন বলেন, চেতনা ফিরলে তারা দেখেন, কয়েকজন লোক তাদের মোবাইল, মানিব্যাগ ও টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। বাসে আটকে থাকার কারণে কিছু্ই বলতে পারছিলাম না তারা। তবে কিছু মানুষ তাদের বাস থেকে বের হতে সহযোগিতা করেছেন।

লুটপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, কিছু মানুষ সব খানেই এরকম আছেন, যারা বিপদের মাঝেও মানুষদের অসহযোগিতা করেন।

“ঘটনার পর দেড় লাখ টাকা ও কিছু মালামাল উদ্ধার করছি, সেগুলো আহত ও নিহতদের স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে” জানান পুলিশ সুপার।

নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি

দুর্ঘটনার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন নাটোরের জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩০ জন। পরে মৃতদেহ বনপাড়া হাইওয়ে থানায় আনার পর জানা যায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। তখন নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, “এটাই কনক্রিট তথ্য, ১২ জন মারা গেছেন, ১৪ জন নয়।”

জেলা প্রশাসকের ভুল তথ্যের বিষয়ে নাটোরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম বলেন, ‘বনপাড়া হাইওয়ে থানা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা তাড়াহুড়ো করে ভুল তথ্য দেওয়ার কারণে জেলা প্রশাসক এবং আমাদের তথ্যে ভুল হয়েছে।’

দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিটি

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ, জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক ও ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

এ সময় নিহতের স্বজনদের জন্য আর্থিক সহায়তাসহ সাত সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন তারা। জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।

নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে সাত সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার।

পরিবারে মৃতদেহ হস্তান্তর

পরিচয় শনাক্তের পর থেকেই শুরু হয় মরদেহ হস্তান্তরের কার্যক্রম। একেকটি পরিবার যখন তাদের প্রিয়জনের মরদেহ থানায় এসে চিনতে পারছিলেন, তখন তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠছিল চারপাশের পরিবেশ।

বনপাড়া হাইওয়ে থানার এসআই আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমরা ১২টি পরিবারের কাছে ১২ জনের মৃতদেহ হস্তান্তর করেছি। যে মালামালগুলো তারা চিহ্নিত করেছে, সেগুলো তাদের পরিবারকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।