ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ, হাজিরা খাতায় মৃত ব্যক্তি, অন্য সমিতির সদস্যরাও

চারঘাটে সমবায় প্রশিক্ষণে ‘ভুয়া’ প্রশিক্ষণার্থী!

অনলাইন ডেস্ক : প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম ৮ বার পঠিত
চারঘাটে সমবায় প্রশিক্ষণে ‘ভুয়া’ প্রশিক্ষণার্থী!

চারঘাটে সমবায় প্রশিক্ষণে ‘ভুয়া’ প্রশিক্ষণার্থী!

দৈনিক রাজশাহী
০১ অক্টো ২০২৬

তৃণমূল পর্যায়ের সমবায়ীদের দক্ষতা বাড়িয়ে সফল সমবায় সমিতি ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে রাজশাহীর চারঘাটে অনুষ্ঠিত সমবায় প্রশিক্ষণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণের হাজিরা ও সম্মানী ভাতার মাস্টার রোল যাচাই করে বেশ কয়েকজন ‘প্রশিক্ষণার্থী’র নাম-পরিচয় ও সমিতির তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি। কারও নাম ব্যবহার করা হয়েছে অন্য সমিতির সদস্যের; আবার যে সমিতির নামে প্রশিক্ষণ দেখানো হয়েছে, সেই সমিতির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর চারঘাট উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের উদ্যোগে দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের তথ্য এবং প্রশিক্ষণের হাজিরা ও সম্মানী ভাতার মাস্টার রোল অনুযায়ী, উপজেলার ২৫টি সমবায় সমিতির ৫০ জন সদস্য এতে অংশ নেন। প্রশিক্ষণার্থীদের প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে সম্মানী, সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার এবং খাতা-কলম দেওয়া হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী জেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. আবু সাইফ। প্রশিক্ষক ছিলেন জেলা সমবায় কার্যালয়ের প্রশিক্ষক নাসির উদ্দীন। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের একটি তালিকার ১৯ নম্বরে ‘আশার আলো গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আজিবার রহমানের নাম, স্বাক্ষর এবং সম্মানী ও খাবার গ্রহণের তথ্য রয়েছে। 

তালিকায় দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে আজিবার রহমান জানান, তিনি চক মোক্তারপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক। আশার আলো সমিতি নামে তাঁর কোনো সমিতি নেই এবং ওই সমিতি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। তাঁর নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হলেও তিনি ওই প্রশিক্ষণে অংশ নেননি বলেও দাবি করেছেন।

পরে আশার আলো গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতিতে যোগাযোগ করে জানা যায়, সমিতিটির সাধারণ সম্পাদক মারা গেছেন। বর্তমানে পদটি শূন্য। সমিতির কোনো সদস্য প্রশিক্ষণে অংশ নেননি বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান।

তালিকার ৭ নম্বরে ‘ভোরের আলো সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাধারণ সম্পাদক জিন্নাত আলীর নাম ও সম্মানী গ্রহণের স্বাক্ষর রয়েছে। তবে তালিকায় দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে জানা যায়, নম্বরটির মালিক কালাম আলী। তিনি সাহাপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সদস্য। 

কালাম আলী জানান, ওই প্রশিক্ষণে তিনি অংশ নেননি এবং তাঁর মোবাইল নম্বর সেখানে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। ভোরের আলো সমিতির সংশ্লিষ্টরাও তাদের কেউ প্রশিক্ষণে অংশ নেননি বলে জানিয়েছেন।

এদিকে তালিকার ১৩ নম্বরে ‘জিদ সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মো. মাইনুল হকের নাম ও স্বাক্ষর রয়েছে। তবে মাইনুল হক বলেন, ‘জিদ সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি নামে কোনো সমিতির নামই আমি কখনও শুনিনি। সাধারণ সম্পাদক হব কীভাবে!’ তবে তিনি প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলেন এবং যেখানে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে, সেখানে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানান। 

অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো সমবায় সমিতির অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া তালিকায় থাকা অন্তত ছয়টি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।

চারঘাট উপজেলায় মোট ৯২টি সমবায় সমিতি রয়েছে। এর মধ্যে কিছু সমিতির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি সমবায় সমিতির অভিযোগ, সমবায় কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পছন্দের কিছু সমিতিকে নিয়ে প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন সমিতির নামে অন্য ব্যক্তিদের দেখিয়ে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়। এর প্রতিবাদ করলে সমিতির নিবন্ধন বাতিলের ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ তাদের। ফলে অনিয়মের বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সমবায়ী।

তাদের আরও অভিযোগ, কিছু সমিতি সমবায়ের নামে সুদের ব্যবসা এবং মৎস্য সমিতির নামে সরকারি পুকুর কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রায় প্রতিটি প্রশিক্ষণেই একই ধরনের অনিয়ম করা হয় বলে অভিযোগ তাদের।

অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা ১০ মিনিটে চারঘাট উপজেলা সমবায় কার্যালয়ে গিয়ে অফিসটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। পরে সাড়ে ৯টা, ১০টা ও ১১টার দিকে গিয়েও অফিস খোলা পাওয়া যায়নি। পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে দুপুরে অফিসের অফিস সহায়ক কৌশিক কুমার দাস এসে ফোনে অফিসে আসতে বলেন।

চারঘাট সমবায় কার্যালয়ে বর্তমানে সমবায় কর্মকর্তা পদে কেউ কর্মরত নেই। অফিসের সিনিয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী পরিদর্শক আজিজ আহমেদ। মঙ্গলবার ও বুধবার দুদিন অফিসে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘তালিকা আমিই করেছি। দু-একজনের নাম এলোমেলো থাকতে পারে, কিংবা টাইপ করার সময় এলোমেলো হতে পারে।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলার জন্য তিনি পরদিন দেখা করতে বলেন। একই সঙ্গে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘দুজন বসে চা খাই, নিউজ করবেন না।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চারঘাট উপজেলা সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘সমবায়ীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে দক্ষ সমবায়ী ও সফল সমবায় সমিতি গড়ে তোলার জন্য যে প্রশিক্ষণ, সেখানে যদি নামে-বেনামে তালিকা করে অনিয়ম করা হয়, তাহলে দক্ষ সমবায়ী গড়ে উঠবে কীভাবে? এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

তবে প্রশিক্ষণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন জেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. আবু সাইফ। তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণে ২৫টি সমিতির ৫০ জন সদস্য অংশগ্রহণ করার কথা। অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

 

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।